যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ান ক্রুড তেলের ৩০ দিনের waiver দিল ভারতে। ইরান যুদ্ধের সংকটে মোদী সরকারের ডিপ্লোম্যাসি কাজ করল? কংগ্রেস বলছে স্ট্র্যাটেজিক সারেন্ডার।
নয়াদিল্লি, ৭ মার্চ ২০২৬: পারস্য উপসাগরে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে বিশ্ব তেল বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়ান ক্রুড অয়েল কেনার জন্য ৩০ দিনের বিশেষ ছাড়পত্র দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে ‘ক্রুড পলিটিক্স’ নামে এক নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এটাকে ‘কূটনৈতিক জয়’ বলে উদযাপন করছে, যখন বিরোধী দলগুলো এটাকে ‘কৌশলগত আত্মসমর্পণ’ বলে সমালোচনা করছে। এই ঘটনা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদেশী নীতি এবং রাজনৈতিক বিভাজনের নতুন দিক তুলে ধরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ধনাগার মন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে ঘোষণা করেন যে, ভারতের তেলশোধনাগুলোকে সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ান তেলের কার্গো কেনার জন্য ৩০ দিনের (৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত) ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এই ছাড়টি শুধুমাত্র ৫ মার্চের আগে লোড করা তেলের লেনদেনের জন্য প্রযোজ্য। পটভূমিতে রয়েছে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, যা হরমুজ প্রণালীতে ভারতের ৪০ শতাংশ তেল আমদানির পথ আটকে দিয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়েছে এবং ভারতের মতো তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য সংকট দেখা দিয়েছে।
ভারত রাশিয়া থেকে সস্তা তেল আমদানি করে এসেছে, যা মোট আমদানির এক বড় অংশ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ান তেলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ভারত এবং চীনের মতো দেশগুলো এটি কিনতে অব্যাহতি রেখেছে। এবার ইরান সংকটে যুক্তরাষ্ট্র নমনীয়তা দেখিয়েছে, কারণ তারাও ভারতকে পরবর্তীতে আমেরিকান তেল কেনার জন্য উৎসাহিত করতে চায়। ভারতীয় স্টেট-রান রিফাইনারি যেমন ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (আইওসি) এবং ভারত পেট্রোলিয়াম (বিপিসিএল) এই আটকে থাকা তেলগুলোর লেনদেন করছিল, যা এখন ছাড়পত্রের কারণে সম্ভব হবে।
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হর্দীপ সিং পুরী এই ছাড়পত্রকে ‘ডিপ্লোম্যাটিক উইন’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর তেল কূটনীতির ফলাফল এটি। ‘এটি আমাদের এনার্জি সিকিউরিটির জন্য প্র্যাগম্যাটিক স্টেপ। মেক ইন ইন্ডিয়া শক্তিশালী করবে এবং নতুন সুযোগ তৈরি করবে।’ বিজেপি নেতারা জোর দিয়ে বলছেন যে, এটি ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ। তারা মোদী সরকারের পশ্চিম এশিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা তুলে ধরছেন, যা ইরান-সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সাহায্য করেছে। এছাড়া, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক এই ছাড়ের সঙ্গে যুক্ত। বিজেপির মতে, এটি ভারতকে তেল সংকট থেকে রক্ষা করেছে এবং ভবিষ্যতে আমেরিকান তেল আমদানি বাড়ানোর পথ খুলেছে।
কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো এটাকে ‘স্ট্র্যাটেজিক সারেন্ডার’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কংগ্রেস নেতারা বলছেন, ‘এটি আমেরিকান ব্ল্যাকমেইলের ফল। ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে তেল কিনতে হচ্ছে, এতে আমাদের সার্বভৌমত্ব কোথায়?’ তারা প্রশ্ন তুলছেন যে, ভারতের তেল কৌশল কতটা দুর্বল যে সংকটে আমেরিকার ছাড়ের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। রাহুল গান্ধীসহ নেতারা সোশ্যাল মিডিয়ায় এটাকে ‘মোদীর ফেলিয়র’ বলে চিহ্নিত করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলও যোগ দিয়েছে এই সমালোচনায়। তাদের মতে, সরকারের বিদেশী নীতি ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি ভবিষ্যতে আরও নির্ভরশীলতা তৈরি করবে। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোতে এই ইস্যুকে জ্বালানি দামবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে বিরোধীরা জনরোষ জাগানোর চেষ্টা করছে।
এই ছাড়পত্র ভারতের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনবে। তেলের দাম স্থিতিশীল থাকলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং ভোক্তাদের পকেটে চাপ কমবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সাময়িক সমাধান। দীর্ঘমেয়াদে ভারতকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে, এটি যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলেছে। চীন এবং অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় ভারতের অবস্থান কী হবে, তা দেখার বিষয়।
পশ্চিমবঙ্গে এই খবর জ্বালানি স্টেশন এবং শিল্পাঞ্চলে আলোচিত হচ্ছে। কলকাতার বাজারে তেলের দাম এখনও স্থিতিশীল, কিন্তু সংকট বাড়লে প্রভাব পড়বে। সরকার এবং বিরোধীদের এই রাজনৈতিক লড়াই কতদিন চলবে, তা সময় বলবে। তবে এই ‘ক্রুড পলিটিক্স’ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিদেশী নীতির এক নতুন অধ্যায় লিখেছে।