CBSE new syllabus 2026
ক্লাউড টিভি বাংলা ডেস্ক : ভারতের স্কুল শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে—“মুখস্থনির্ভর শিক্ষা”। পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য জ্ঞান নয়, বরং তথ্য মুখস্থ করাই হয়ে উঠেছিল মূল লক্ষ্য। সেই প্রেক্ষাপটেই বড়সড় সংস্কারের পথে হাঁটল Central Board of Secondary Education। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর হতে চলেছে নতুন সিলেবাস ও মূল্যায়ন পদ্ধতি, যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের (CBSE new syllabus 2026) ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে National Education Policy 2020-এর মূল ভাবনা—শিক্ষাকে আরও বাস্তবমুখী, বিশ্লেষণধর্মী এবং দক্ষতাভিত্তিক করে তোলা। ফলে শুধু পরীক্ষার নম্বর নয়, বরং শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশই এখন মূল্যায়নের মাপকাঠি হতে চলেছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে বোর্ড পরীক্ষার কাঠামোয়। দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা এখন বছরে দু’বার বোর্ড পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাবে। এই ‘Biannual Exam’ পদ্ধতিতে বাধ্যতামূলক কিছু নেই—একবার বা দু’বার, যেভাবে ইচ্ছা পরীক্ষা দেওয়া যাবে। তবে দু’বার পরীক্ষা দিলে সেরা নম্বরটিই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এই ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে এবং “একবারের পরীক্ষায় সবকিছু নির্ভর” মানসিকতা ভাঙতে সাহায্য করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও এসেছে মৌলিক পরিবর্তন। প্রায় ৫০% প্রশ্ন থাকবে MCQ, Case-Based এবং Assertion-Reasoning ধরনের। অর্থাৎ, শুধু তথ্য জানা নয়, সেই তথ্য ব্যবহার করে বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যাচাই করা হবে। এই পদ্ধতি Bloom’s Taxonomy-এর উচ্চতর স্তর—Analysis, Evaluation এবং Creation—এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে Critical Thinking বা বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনা গড়ে তোলাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
একই সঙ্গে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে দীর্ঘ ও সংক্ষিপ্ত উত্তরের প্রশ্নের পরিমাণ। তার পরিবর্তে গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে প্রজেক্ট, প্র্যাকটিক্যাল এবং ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র পরীক্ষার খাতার উপর নির্ভরশীল থাকবে না, বরং সারা বছরের কাজের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হবে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল Holistic Progress Card বা HPC। এটি একটি ৩-ডিগ্রি মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী নিজে, তার সহপাঠী এবং শিক্ষক—তিনজনই মূল্যায়নে অংশ নেবে। এর ফলে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব, আচরণ, দলগত কাজের দক্ষতা—সবকিছুর উপর নজর দেওয়া সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও তাল মিলিয়ে এগোতে চাইছে এই নতুন ব্যবস্থা। Programme for International Student Assessment-এর মতো পরীক্ষায় ভালো ফল করা দেশগুলির (যেমন সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া) শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় চালু হচ্ছে ‘ক্রেডিট সিস্টেম’। বছরে মোট ১২০০ ঘণ্টার শিক্ষাক্রমকে ৪০ ক্রেডিটে ভাগ করা হয়েছে। প্রতি ৩০ ঘণ্টা পড়াশোনার জন্য ১ ক্রেডিট দেওয়া হবে। এর মধ্যে শুধু অ্যাকাডেমিক বিষয় নয়, খেলাধুলা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, শিক্ষার সংজ্ঞা এখন আরও বিস্তৃত।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনগুলির মধ্যে একটি হল গণিত ও বিজ্ঞানে ‘টু-লেভেল’ সিস্টেম। নবম শ্রেণী থেকেই শিক্ষার্থীরা Standard ও Advanced—এই দুই স্তরের মধ্যে বেছে নিতে পারবে। Standard স্তর বাধ্যতামূলক হলেও Advanced স্তর ঐচ্ছিক। যারা ভবিষ্যতে Engineering বা মেডিক্যালের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যেতে চায়, তারা Advanced পেপারের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি “Differentiated Instruction”-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ—যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার নিজস্ব ক্ষমতা ও আগ্রহ অনুযায়ী শেখার সুযোগ পায়।
সব মিলিয়ে, CBSE-র এই নতুন সিলেবাস শুধু একটি পাঠ্যক্রম পরিবর্তন নয়—এটি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার দর্শন বদলে দেওয়ার প্রয়াস। মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষতা, বিশ্লেষণ এবং সৃজনশীলতার উপর জোর দেওয়া—এই পরিবর্তন ভবিষ্যতের ভারতকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটাই এখন দেখার।