Hangor Submarine Pakistan China
ক্লাউড টিভি ডেস্ক : ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নতুন সামরিক সমীকরণ তৈরি করতে চলেছে চীন-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা জোট। প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের জন্য তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক Hangor-class সাবমেরিন। সম্প্রতি চীনের সানইয়া নৌঘাঁটিতে পাকিস্তান নৌবাহিনীর হাতে প্রথম Hangor-class সাবমেরিন (Hangor Submarine Pakistan China) আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে ঘিরেই দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই প্রকল্প শুধু একটি অস্ত্রচুক্তি নয়, বরং ভারত মহাসাগরে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-কৌশলগত উপস্থিতিরও বড় ইঙ্গিত। পাকিস্তানের জন্য মোট আটটি Hangor-class সাবমেরিন তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি তৈরি হবে চীনে এবং বাকি চারটি করাচি শিপইয়ার্ডে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে।
Hangor-class আসলে চীনের Type 039A বা Yuan-class ডিজেল-ইলেকট্রিক attack submarine-এর পাকিস্তানি সংস্করণ। এগুলিতে রয়েছে Air Independent Propulsion (AIP) প্রযুক্তি, যার ফলে সাবমেরিন দীর্ঘ সময় জলের নীচে থেকে কাজ করতে পারে এবং সহজে শত্রুপক্ষের রাডারে ধরা পড়ে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, AIP প্রযুক্তিই এই সাবমেরিনগুলির সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ সাধারণ ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর জলের উপরে উঠে ব্যাটারি চার্জ করতে হয়। কিন্তু AIP থাকলে বহুদিন জলের নীচে লুকিয়ে থাকা সম্ভব হয়। ফলে ভারত মহাসাগরে পাকিস্তানের “silent strike capability” উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। ২০১৫ সালে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটিকে চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক রফতানি চুক্তিগুলির অন্যতম বলেও মনে করা হয়।
সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট Asif Ali Zardari এবং নৌপ্রধান Admiral Naveed Ashraf চীনের Sanya ঘাঁটিতে প্রথম PNS Hangor কমিশনিং অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই অনুষ্ঠানকে “all-weather strategic partnership”-এর প্রতীক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাবমেরিনগুলি শুধু পাকিস্তানের নৌক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতিও কার্যত আরও গভীর করবে। কারণ এই প্রকল্পে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, maintenance এবং অস্ত্র ব্যবস্থার ক্ষেত্রে চীনের উপর পাকিস্তানের নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদি হবে।
বিশেষ করে Gwadar বন্দর, China-Pakistan Economic Corridor (CPEC) এবং আরব সাগরে চীনের বাণিজ্যিক ও সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে এই সাবমেরিন প্রকল্পকে একসূত্রে দেখছেন কৌশলবিদরা। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে ভারত মহাসাগরে anti-access/area denial strategy তৈরিতে Hangor-class গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের Project 75I নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে Scorpene-class, Kilo-class এবং Arihant-class পারমাণবিক সাবমেরিন থাকলেও নতুন generation attack submarine প্রকল্প এখনও ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত যদি দ্রুত নতুন AIP-enabled সাবমেরিন না আনে, তাহলে ভারত মহাসাগরে undersea warfare capability-র ক্ষেত্রে কৌশলগত ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
যদিও সবকিছুই পাকিস্তানের পক্ষে যাচ্ছে এমন নয়। কিছু রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, করাচি শিপইয়ার্ডে স্থানীয়ভাবে সাবমেরিন তৈরির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সমস্যা, দক্ষ কর্মীর অভাব এবং ইঞ্জিন সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিয়েছে। ফলে প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পে কিছু বিলম্ব হলেও চীন যে পাকিস্তানকে ভারত মহাসাগরে শক্তিশালী সামুদ্রিক অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে, তা স্পষ্ট।
“Hangor” নামটিরও বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানের সাবমেরিন PNS Hangor ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ INS Khukri ডুবিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানে সেই ঘটনাকে এখনও বড় সামরিক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। নতুন সাবমেরিন প্রকল্পেও সেই নাম ব্যবহার করা হয়েছে প্রতীকী বার্তা হিসেবেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন Hangor-class শুধু অস্ত্র নয়, বরং ভারত মহাসাগরে চীন-পাকিস্তান কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার নতুন অধ্যায়ের প্রতীক।