Delimitation India 2026
অরিন্দম নাথ : ভারতের রাজনীতিতে ‘ডিলিমিটেশন’ শব্দটি নতুন নয়, কিন্তু ২০২৬ সালকে সামনে রেখে এই শব্দটিই এখন নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বহুদিন ধরে স্থগিত থাকা লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাসের(Delimitation India 2026)প্রক্রিয়া আবার শুরু হতে চলেছে—আর তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে সংবিধান, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, জনসংখ্যার রাজনীতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের জটিল অঙ্ক।
ভারতের সংবিধানের Article 81 of Indian Constitution ও Article 82 of Indian Constitution স্পষ্টভাবে বলে, জনগণনার পর লোকসভা আসনের পুনর্বিন্যাস করা উচিত। অর্থাৎ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংসদীয় প্রতিনিধিত্বও বদলাবে—এটাই ছিল সংবিধান প্রণেতাদের ভাবনা। কিন্তু বাস্তব রাজনীতির প্রয়োজনে এই প্রক্রিয়া বহুবার স্থগিত হয়েছে। ১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার সময় Indira Gandhi সরকার প্রথমবার ডিলিমিটেশন স্থগিত করে। পরে ২০০১ সালে Atal Bihari Vajpayee-র সরকার সেই স্থগিতাদেশ আরও বাড়িয়ে ২০২৬ পর্যন্ত নিয়ে যায়।
ফলে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে দেশের লোকসভা আসনের সংখ্যা ও বণ্টন কার্যত অপরিবর্তিত থেকেছে, যদিও জনসংখ্যার মানচিত্র আমূল বদলে গেছে। উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি তুলনামূলকভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। এই অসম বৃদ্ধিই এখন ডিলিমিটেশনকে একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে।
২০২৩ সালে পাস হওয়া মহিলা সংরক্ষণ বিল—যার সাংবিধানিক ভিত্তি Article 334A of Indian Constitution—এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। কারণ এই বিল কার্যকর করতে হলে নতুন করে আসন বিন্যাস এবং সংরক্ষণের কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, ডিলিমিটেশন এড়ানোর আর কোনও পথ কার্যত খোলা নেই।
এখানেই শুরু হচ্ছে আসল রাজনৈতিক লড়াই। প্রশ্ন হল—ডিলিমিটেশন কীভাবে হবে? শুধুমাত্র জনসংখ্যার ভিত্তিতে, নাকি একটি ভারসাম্যপূর্ণ মডেলে? কেন্দ্রের তরফে একটি প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছিল, যেখানে লোকসভা আসনের সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৮৫০ করার কথা বলা হয়। যুক্তি ছিল, মোট আসন বাড়ালে নতুন জনসংখ্যার অনুপাত মেনে পুনর্বিন্যাস করা যাবে, আবার দক্ষিণের রাজ্যগুলির বর্তমান আসনও অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হবে।
এই প্রস্তাবের পেছনে রাজনৈতিক কৌশল যেমন ছিল, তেমনই ছিল একটি বাস্তব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা। কারণ শুধুমাত্র জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস করলে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলি—যেমন উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ—বড় লাভবান হবে। অন্যদিকে তামিলনাড়ু, কেরল, কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলি তুলনামূলকভাবে আসন হারাবে বা তাদের প্রভাব কমে যাবে।
কিন্তু এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল সংবিধান সংশোধন, যার জন্য ২/৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার। বিরোধী দলগুলি, বিশেষ করে Dravida Munnetra Kazhagam এবং দক্ষিণের অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি, এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। তাদের আশঙ্কা ছিল—এতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য আরও উত্তর ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়বে এবং রাজনৈতিকভাবে বিজেপি লাভবান হতে পারে।
এই বিরোধিতার ফলে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদি আসন সংখ্যা না বাড়িয়ে সরাসরি ডিলিমিটেশন করা হয়, তাহলে তা সম্পূর্ণভাবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে হবে। এতে দক্ষিণের রাজ্যগুলির আপেক্ষিক প্রতিনিধিত্ব কমার সম্ভাবনা প্রবল। আবার যদি আসন বাড়ানোর প্রস্তাব পাস না হয়, তাহলে কেন্দ্রের হাতে খুব বেশি বিকল্পও থাকবে না।
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই রাজনৈতিক দাবা খেলার সঙ্গে তুলনা করছেন। কেন্দ্র বলতে পারে—তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান দিতে চেয়েছিল, কিন্তু বিরোধীরা তা আটকেছে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলতে পারে—জনসংখ্যা ভিত্তিক প্রতিনিধিত্বই গণতন্ত্রের মূল নীতি।
তবে এই পুরো বিতর্কে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—ভারতের ফেডারেল কাঠামো। সংবিধান অনুযায়ী, ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ডিলিমিটেশন সেই ভারসাম্যকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। কারণ লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, বরং কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণেও প্রভাব বিস্তার।
দক্ষিণের রাজ্যগুলি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষার হার এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে রয়েছে। তাদের যুক্তি—এই সাফল্যের ‘শাস্তি’ হিসেবে যদি তাদের সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব কমে যায়, তাহলে তা অন্যায্য হবে। অন্যদিকে উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির যুক্তি—জনসংখ্যা বেশি হলে প্রতিনিধিত্বও বেশি হওয়া উচিত, সেটাই গণতন্ত্রের মূল কথা।
এই দুই যুক্তির মধ্যে সমঝোতা খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ একবার ডিলিমিটেশন হয়ে গেলে তার প্রভাব বহু বছর ধরে থাকবে।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬-এর ডিলিমিটেশন শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়—এটি ভারতের গণতন্ত্রের কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এখানে নেওয়া সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে, আগামী দশকগুলিতে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকবে। আর সেই কারণেই এই বিতর্ক এতটা তীব্র, এতটা গুরুত্বপূর্ণ।