India’s Hormuz Message at BRICS
ক্লাউড টিভি ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমশ জটিল হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার আবহে এবার ব্রিকস মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা (India’s Hormuz Message at BRICS) দিল ভারত। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকে ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) খোলা ও নিরাপদ রাখা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। ভারতের ক্ষেত্রেও এই রুট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের মোট তেল আমদানির একটি বড় অংশ পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও ভারতের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্রিকস বৈঠকে ভারত “সংলাপ, স্থিতিশীলতা এবং অবাধ নৌ চলাচল”-এর উপর জোর দিয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত একদিকে যেমন ইরান ও ইউএই উভয় পক্ষের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে, তেমনই আন্তর্জাতিক মহলকে জানাতে চাইছে যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কোনও বাধা মেনে নেওয়া হবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে একাধিক উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা সামনে এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, ওই অঞ্চলে একাধিক জাহাজকে আটকানো বা নজরদারির ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ভারতীয় স্বার্থ জড়িত কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও ভারত সরকার সরাসরি কোনও সংঘর্ষের কথা উল্লেখ করেনি, তবে বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উপর “ঘনিষ্ঠ নজর” রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা বাড়লে তার প্রথম প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। ইতিমধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দামে ওঠানামা শুরু হয়েছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে দেশের পরিবহণ, শিল্প এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব পড়তে পারে। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
এদিকে ব্রিকস বৈঠকে ইরান এবং ইউএই প্রতিনিধিদের মধ্যে কূটনৈতিক মতবিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে বলে আন্তর্জাতিক সূত্রের খবর। পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান একেবারেই আলাদা। ফলে বৈঠকের যৌথ বিবৃতি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। কারণ ভারত একদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে ইউএই বর্তমানে ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সহযোগী। তাই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও দিল্লি এখনও “ব্যালান্সড ডিপ্লোম্যাসি”-র পথেই হাঁটছে।
ভারতের বক্তব্যে (India’s Hormuz Message at BRICS) আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—দক্ষিণ এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতা এখন শুধু আঞ্চলিক ইস্যু নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ব জ্বালানি বাজার এমনিতেই অস্থির। তার মধ্যে যদি হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে সংকট তৈরি হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড়সড় প্রভাব পড়তে পারে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্রিকস মঞ্চে ভারতের এই বার্তা মূলত তিনটি দিককে সামনে রেখেই দেওয়া হয়েছে—প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা; এবং তৃতীয়ত, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখা।