Iran Hormuz Strait Strategy
ক্লাউড টিভি ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট ‘হরমুজ প্রণালী’কে কেন্দ্র করে এক নতুন ধরনের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল (Iran Hormuz Strait Strategy) সামনে আনছে ইরান। আন্তর্জাতিক মহলের মতে, “ভবিষ্যতের যুদ্ধ” এখন আর শুধুমাত্র সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক পথ নিয়ন্ত্রণের লড়াই।
Strait of Hormuz বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের অন্যতম প্রধান রুট। এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছয়। ভারত, চীন, জাপান-সহ এশিয়ার বহু দেশ এই রুটের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান উত্তেজনার আবহে ইরান এই প্রণালীকে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে দাবি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের। ইরান বুঝে গিয়েছে যে আমেরিকার মতো সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়েও বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলা সম্ভব— যদি হরমুজ প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।
শুধু তেল পরিবহণ নয়, এবার সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবল নিয়েও নতুন চাপ তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলির দাবি, ইরান হরমুজ অঞ্চলের সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল ব্যবহারের জন্য “লাইসেন্স ফি” বা “টোল” আদায়ের ধারণাও সামনে আনছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, বাস্তবে তা কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটাই “স্ট্রাকচারাল লেভারেজ ওয়ারফেয়ার”— অর্থাৎ এমন কোনও ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিক কাঠামোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, যা ছাড়া বিশ্ব অর্থনীতি কার্যত অচল। হরমুজ প্রণালী সেই ধরনেরই এক ‘চোকপয়েন্ট’। ইরান এই রুটে চাপ সৃষ্টি করলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ে, শিপিং খরচ বেড়ে যায় এবং বহু দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব পড়ে।
ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বীমা সংস্থাগুলি হরমুজ অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের জন্য অতিরিক্ত যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম নিচ্ছে। বহু বড় তেলবাহী জাহাজ বিকল্প রুট খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। এর জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের বড় অংশই আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে এবং তার অধিকাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে ভারতের তেলের আমদানি খরচ বাড়তে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পেট্রল-ডিজেলের দামে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি ও পরিবহণ খরচও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলি হরমুজে নিরাপদ জাহাজ চলাচল বজায় রাখতে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে— যুদ্ধের নতুন সংজ্ঞা এখন ‘অস্ত্র’ নয়, বরং ‘অবস্থান’।